উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় অনেক বছর ধরে অভিবাসন দ্রুত হারে বাড়লেও সম্প্রতি সে গতি ধীর হয়ে এসেছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে অভিবাসন আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৪ শতাংশ। বিশেষ করে শ্রমভিত্তিক অভিবাসন বা কাজের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। খবর ইউরো নিউজ।
ইউরোপসহ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংকট দেখা যাচ্ছে। এতে বেড়ে গিয়েছে বিদেশী কর্মীর চাহিদা। স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, সেবা খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট পূরণে অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিলেন। তবে নতুন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রবণতা এখন বদলাতে শুরু করেছে। শ্রমবাজার কিছুটা শ্লথ হওয়ায় এবং কিছু দেশে ভিসা নীতিমালা কঠোর হওয়ায় শ্রমভিত্তিক অভিবাসন কমতে শুরু করেছে।
ওইসিডি মহাসচিব মাথিয়াস কোরমান বলেন, ‘ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে অভিবাসন। অভিবাসীরা অনেক দেশে শ্রম ঘাটতি মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছেন। কার্যকর অভিবাসন নীতির মাধ্যমে জনসেবায় চাপ সামাল দেয়া এবং অভিবাসীদের কর্মবাজারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সহজ করা জরুরি।’
অভিবাসন কমার ফলে শ্রমবাজারে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্যও দেখছেন। মাথিয়াস কোরমান বলেন, ‘অনেক দেশে আয়ের ক্ষেত্রে অভিবাসী ও স্থানীয়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। অনেক অভিবাসী এখনো স্থানীয় কর্মীদের তুলনায় কম আয় করেন। এ অবস্থায় বিদেশী ডিগ্রি ও শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সহজে স্বীকৃতি দেয়া, ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও চাকরি অনুসন্ধানে সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।’
অবশ্য শ্রমভিত্তিক অভিবাসন কমলেও পরিবারভিত্তিক ও মানবিক (আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থী) অভিবাসন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে আশ্রয়দাতা দেশগুলোয় কিছু সমস্যাও বাড়ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, পরিবারভিত্তিক ও মানবিক কারণে অভিবাসন কিছুটা বেড়েছে। এ ধরনের অভিবাসন বাড়ায় অনেক দেশে আবাসন, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল, সেগুলোও এখন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
তবে সার্বিকভাবে অভিবাসনের সংখ্যা এখনো কভিড মহামারীর আগের তুলনায় বেশি। গত বছর ওইসিডির সদস্যদেশগুলোয় প্রায় ৬২ লাখ বিদেশী স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
ইউরোপে জার্মানি, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশে শ্রমভিত্তিক অভিবাসন মহামারীর আগের তুলনায় কমে গেছে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি উন্নত অর্থনীতিতে শ্রম সংকট বাড়াচ্ছে। এ কারণে অভিবাসন না বাড়লে ২০৬০ সালের মধ্যে সদস্যদেশগুলোর মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। মধ্যম আয় বৃদ্ধির হার বার্ষিক প্রায় দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত ধীর হয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধরন পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে অভিবাসন এখনো গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে সুসমন্বিত ও বাস্তবসম্মত অভিবাসন নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত।